কথার কথা - ২

আমার জীবনে আর্বিতিত হওয়া বিভিন্ন অভিজ্ঞতার আলোকে “কথার কথা” নামে বিভিন্ন কথা নিয়ে একটি ধারাবাহিক কথামালা রচনার উদ্যোগ নিয়েছি। নিম্নে তারই একটি তুলনামূলক নমুনা উল্লেখ করা হলো।


মূল কথা:
“যাহা বলিব সত্য বলিব, সত্য বৈ মিথ্যা বলিব না। মহামান্য আদালত, কাঠগড়ার অপর পাশে বাদীপক্ষ আমার কেউ নন। আর আপনি যে ছেলে-মেয়ের ভরণ পোষণ দেয়ার কথা বলছেন, ঐ ছেলে-মেয়ের পিতা আমি নই। যে ছেলে-মেয়েকে আমি নিজের সন্তান মনে করি না, তাদের আমি ভরণ পোষণের খরচ দেবো কেন? ঐ রকম ছেলে-মেয়ে রাস্তা ঘাটে পাওয়া যায়। হুজুর, আমি চাকুরীর কারণে বাড়িতে থাকি না, দুই তিন মাস পর বাড়িতে আসি কি আসি না, তার কোন ঠিক নাই। আমার অনুপস্থিতিতে ঐ চরিত্রহীন মহিলা কাকে দিয়ে ঐ সন্তান দুটো জন্মাইছে তা আমি বলতে পারি না, ঐ ছেলে-মেয়ে যেহেতু আমার না, তাই আমি তার ভরণ পোষণ বাবদ কোন টাকা পয়সা দিতে পারবো না।”

কথাটি এমনও হতে পারতো-
“যাহা বলিব সত্য বলিব, সত্য বৈ মিথ্যা বলিব না এবং সত্যকে অস্বীকার করিব না। মহামান্য আদালত, কাঠগড়ার অপর পাশে বাদী হিসেবে যে মহিলা এবং দুই ছেলে মেয়েকে দেখতে পাচ্ছেন, তারা আমার পরিবার। আপনি যে ছেলে-মেয়ের ভরণ পোষণ দেয়ার কথা বলছেন, তারা আমারই সন্তান। রাস্তা ঘাটে ওদের বয়সী কোন ছেলে-মেয়েকে দেখলেই ওদের কথা আমার মনে পরে। হুজুর, আমি চাকুরীর কারণে বাড়িতে থাকি না, স্ত্রী সন্তানের মুখ দেখতে দুই তিন মাস পরপর ব্যকুল হয়ে বাড়িতে আসি। তবে আমার অনুপস্থিতিতে আমার স্ত্রী যেভাবে আমার সংন্তান এবং সংসারের খেয়াল রাখে তা দেখে আমি মুগ্ধ, আবিভূত। আমার স্ত্রী এবং সন্তানদের ভরণ পোষণের খরচ দেয়া এবং তাদের প্রতি যত্নবান হওয়া, একজন স্বামী এবং পিতা হিসেবে আমার নৈতিক দ্বায়িত্ব।” 

পুনঃশ্চ, মূল কথাগুলোর বক্তা কে ছিলো তা এখানে আলোচ্য বিষয নয়, মূল কথার ভাবার্থই এখানে মূখ্য আলোচ্য বিষয়। তবে কথাগুলোকে আসমানী কথা বা আকাশ কুসুম কল্পনা ভেবে এড়িয়ে যাওয়াই আপনার জন্য উচিত হবে। কারণ কথাগুলো লেখার সময় আমি বিমানে অবস্থান করছিলাম, এবং বিমান তখন আকাশে উড্ডীয়মান ছিলো।

আরিফুর রহমান
০২.০৯.২০১৯
পোল্যান্ড - নরওয়ে আকাশ পথে

কথার কথা - ১

আমার জীবনে আবর্তিত হওয়া বিভিন্ন অভিজ্ঞতার আলোকে “কথার কথা” নামে বিভিন্ন কথা নিয়ে একটি ধারাবাহিক কথামালা রচনার উদ্যোগ নিয়েছি। নিম্নে তারই একটি তুলনামূলক নমুনা উল্লেখ করা হলো।


মূল কথা: 
 “তুমি আইজ যত বড়-ই হও, যতই দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়াও, যত টাকার মালিক-ই হও, ভুলে যাইয়ো না, এক কালে গ্রামে থাকতে, আমাদের ছাগল ভেড়া চড়াইচেও, আর শহরে থাকতে আমাদের বাজারের ব্যাগ টানিচেও।” - এ কথা তাচ্ছিল্যের, এ কথা অনাত্মীয়তার।

 কথাটি এমনও হতে পারতো- 
“তুমি আজ যত বড়-ই হও, পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকো না কেন, একটা কথা মনে রেখো, আমাদের দোয়া এবং শুভ কামনা সব সময় তোমার সঙ্গে আছে, তুমি সব সময় সুন্দর এবং নিরাপদে থাকো এটাই আমাদের কামনা।” - এ কথা আন্তরিকতার, এ কথা আত্মীয়তার।

 পুনঃশ্চ, মূল কথাগুলোর বক্তা কে ছিলো তা এখানে আলোচ্য বিষয নয়, মূল কথার ভাবার্থই এখানে মূখ্য আলোচ্য বিষয়। তবে কথাগুলোকে আসমানী কথা বা আকাশ কুসুম কল্পনা ভেবে এড়িয়ে যাওয়াই আপনার জন্য উচিত হবে। কারণ কথাগুলো লেখার সময় আমি বিমানে অবস্থান করছিলাম, এবং বিমান তখন আকাশে উড্ডীয়মান ছিলো।

আরিফুর রহমান
২৮.০৮.২০১৯
নরওয়ে - পোল্যান্ড আকাশ পথে

বাংলা ভাষা

বাংলা এমন একটি ভাষা,
যে ভাষা বক্তাকে দেয় স্বাধীনতা;
ভাব প্রকাশের,
ব্যাক্য গঠনের,
শব্দ চয়নের।
যথা: “আমি ভাত খাই।
খাই আমি ভাত।
আমি খাই ভাত।
ভাত আমি খাই”।
সকলই সঠিক বাক্য ভাব প্রকাশে।

বাংলা এমন একটি ভাষা,
যে ভাষায় লিঙ্গ বৈষ্যম্য বিলীন।
নারী ও পুরুষ কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে
একই বাক্যে বলতে পারে;
আমি তোমায় ভালোবাসি।
আমি তোমায় ভালোবাসি।

বাংলা এমন একটি ভাষা,
যে ভাষায় মানুষ প্রকাশ করে
সম্মান, ভালোবাসা, স্নেহ;
আপনি, তুমি, তুই
আবেগ ও সম্পর্কের অনুপাতে।

বাংলা পৃথিবীর সহজতম ভাষা,
এ ভাষা বাঙালির ঐতিহ্য,
আবেগ প্রকাশের পরিভাষা।

অনুকরণীয় অনুসরণীয়

সকলেই অনুকরণীয় হয় না।  মানুষ সবাইকে অনুকরণ বা অনুসরণ করে না। অনুকরণীয় বা অনুসরণীয় হবার মতো যোগ্যতা বা গুণাবলী রয়েছে মানুষ কেবল তাদেরকেই অনুসরণ করে।

বাল্যকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃজনশীল, শৈল্পিক গুণাবলী সমূহ আমাকে মুগ্ধ, অনুপ্রাণিত এবং প্রভাবিত করেছিল।
শব্দে শব্দ গেঁথে কবিতা লিখতে শুরু করেছিলাম, কিছু গল্প লিখেছিলাম, যদিও এ সকলই বাল্যকালের কথা, পাণ্ডুলিপি গুলো হারিয়ে গেছে সেই কবে কালের স্রোতে।  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে আঁকা ছবি দেখে প্রথম উপলব্ধি করেছিলাম ছবি আঁকা খুব সোজা, ছবি আঁকায় ভুল বলে কিছু নাই।
তবে আমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অনুকরণ বা অনুসরণ করিনি, আমি শুধু তার মতো সৃজনশীল গুণাবলী সমূহ আত্মস্থ করার চেষ্টা করেছিলাম যা আমায় মুগ্ধ করেছিল। আমিও ছবি আঁকি, আমিও কবিতা লিখি এর মানে আমি তাকে অনুকরণ বা অনুসরণ করি।  আমি নিশ্চিত বলতে পারি আমার মতো আরো অনেকেই আছে যারা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃজনশীল গুণাবলীর দ্বারা প্রভাবিত।
আমার আঁকা ছবি, আমার কবিতা বা লেখা আমার ভাবনা আর চিন্তা চেতনা আমার মত করে আমার ভাষায় প্রকাশ করি এটাই আমার মৌলিকত্ব।

বাল্যকালে মোনালিসা পেইন্টিংটাকে একটা স্থির আলোকচিত্র ভাবতাম। কৈশোরে এসে যখন জানলাম এটি স্থির আলোকচিত্র নয় প্রকৃত পক্ষে এটি লিওনার্দো দা ভিঞ্চির আঁকা একটি তৈলচিত্র। তখন আমি খুব অবাক হয়েছিলাম এই ভেবে যে একজন মানুষের পক্ষে কিভাবে এতো নিখুঁত এবং প্রাণবন্তভাবে একজন মানুষের প্রতিকৃতি আঁকতে পারে!?
এরপর আমি প্রতিকৃতি আঁকতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। সে সময় দিনরাত ছবি আঁকতাম, ছবি আঁকা ছিল আমার একমাত্র নেশা। সে সময় প্রায় শতাধিক প্রতিকৃতি ক্যানভাসে বা রংতুলিতে এঁকেছিলাম।

যৌবনে এসে শ্রদ্ধেয় শিশির ভট্টাচার্যের আঁকার ধরণ এবং কার্টুন বা ক্যারিকেচারের প্রান্তরেখা (আউটলাইন) দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। তখন কলম ছিলো আমার কার্টুন আঁকার একমাত্র হাতিয়ার, তাই তার মতো করে প্রান্তরেখা আঁকার চেষ্টা করতাম। শিশির ভট্টাচার্যের চৌকষ এবং পেশাদারী অঙ্কন শৈলী আমার সবচেয়ে প্রিয়।

ঐ একই সময় মামুন হোসাইন ভাইয়ার আঁকা কার্টুন দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। তার আঁকা চরিত্রগুলির অভিব্যক্তি এবং উপস্থাপন দেখে মনে হয়েছিল কার্টুন আঁকা খুবই সোজা।
শুরুর দিকে মামুন হোসাইনের আঁকার ধরণ অনুসরণ করার চেষ্টা করতাম। পরে অবশ্য আমার মতো করে আঁকতে শুরু করি এবং নিজস্ব আঁকার ধরণ দাঁড় করি। 

আমি মনে করি প্রতিটি মানুষের বিশেষ গুণাবলী রয়েছে যা কাউকে না কাউকে মুগ্ধ করে।
কখনো যদি শুনি আমাকে কেউ আমার বিশেষ গুণাবলীর জন্য অনুকরণ বা অনুসরণ করে তাহলে আমি খুশি হই এই ভেবে যে একজন মানুষকে দেয়ার মতো বা অনুপ্রাণিত করার মতো আমার কিছু আছে। 

মুহূর্তের আলিঙ্গনে

বছর খানেকের তরে আমি ভুলে যেতে চাই,
কে আমি, কোথায় ছিলাম, কোথায় এলাম,
কি হারালাম, কি পেলাম,
কোনটা নামি, কোনটা দামি।

উদাসীন আমি, ভাবনা ছিল কম জীবন, ভবিষৎ প্রসঙ্গে
অল্পতেই ছিলাম তুষ্ট, সন্তুষ্ট।
চলতাম সময় স্রোতে বেহুঁশে গা ভাসিয়ে।
ঋতুর পরে ঋতু এসে চলে গেছে, আমি থেকেছি
সকল প্রহরে একই ঘরে, একই তরে, বেখেয়ালিতে।
বিচ্ছিন্ন ছিলাম, ছিলাম বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে।
ছিলাম আমার পথে একা,
অচেনা সে পথে বসন্ত দেয়নি দেখা।
হিমেল হাওয়া দিয়েছে দোলা,
নিযুত বছর ধরে যেভাবে দিয়ে চলেছে
সবার চুলে, সবার গালে।

যে মুহূর্ত চলে গেছে সে তো আর আসবে না,
হয়তো আসবে নতুন মুহূর্ত, হয়তো সেটি হবে উত্তম
অথবা অন্য রকম।
আমি প্রস্তুত নতুন মুহূর্তকে আলিঙ্গন করতে।

শৈশবের নীতি কথা

পরিশ্রমে ধন আনে
পূন্যে আনে সুখ।
আলস্য দারিদ্র্য আনে
পাপে আনে দুঃখ।
উপরের কথা গুলো আমার নয়, আমার নানী প্রায়ই কথা গুলো বলতেন এবং নানীর ঘরের দেয়ালে লিখে বাঁধানো ছিলো। কথা গুলোর রচয়িতা আমার অজ্ঞাত। তবে কথাগুলো যারই রচিত হোক না কেন, কথা গুলো সার্বজনীন অর্থবহ চিরন্তন সত্য কথা।
আমার শৈশবে নানীর মুখে ছন্দময় আরো অনেক কথাই শুনেছি। তাঁর সকল কথার অর্থ আমি তখন বুঝতাম না তবে এখন সব কিছুই বুঝতে পারি। নানীর মুখে শোনা উপরের কথা গুলোকে আমি জীবন দর্শন মনে করি।

দূরত্ব

একটা সময় ছিল যখন পারস্যের কন্যার সাথে প্রণয় ছিল। যদিও দুজন ছিলাম দুই মহাদেশের বাসিন্দা, দূরত্বের কাছে মাথা নোয়াবার নই; এমনি ছিল মনোবল। একে অন্যের সাথে দেখা করার জন্য সকল বাঁধা পাহাড় পর্বত ডিঙিয়ে, দূরত্বকে পিছনে ফেলে নয়নে নয়ন মেলাতে বছরে দুই একবার পাড়ি জমাতাম দুই মহাদেশের মিলন স্থলে, তুরস্কে।
দুজন একসাথে, আমার হাত তাঁর বগলে, একসাথে  ঘুরতাম - বেড়াতাম ইস্তানবুল, আন্তালিয়ার পথে প্রান্তরে, নীল আকাশের নিচে, সাগর তীরে, অরণ্যে - লোকালয়ে, রাস্তায় মানুষের ভিড়ে, পারস্য কন্যা আমার হাত ছাড়তোনা কখনোই।
পাথরের আসনে দুজনে মুখোমুখি বসে জোস্না রাতে, হাতে হাত রেখে পূর্ণিমা দর্শন, জোস্নায় স্নান। ভূমধ্যসাগরের জল চিকচিক করতো চন্দ্র আলোয়, হাওয়ার আবেশে, দুইজন দর্শক
আমি আর সে, অনুভূতিরা গভীর হতো রাতের সাথে।

বিদায় বেলায় তাঁর মাথা আমার কাঁধে, ভিজতো গাল তাঁর নয়ন জলে তবু ঠোঁটে হাসি কথার ছলে, যেতে হবে ছেড়ে তবু মন বাঁধ সাধে, আমি সান্তনা দিতাম; আবার দেখা হবে বছর গড়ালে।
হাওয়াই জাহাজ উড়াল দিতো, হয়ে যেত সে মেঘের আড়ালে, চোখের আড়ালে।

বাড়ি ফিড়ে শুরু হতো আবার দুজনের দিন গোনা। দিন গুনতে গুনতে, একদিন দিন আবার আসতো ফিড়ে, দুজনে মিলতাম, হাতে হাত রাখতাম সাগর তীরে, চাঁদনী রাতে, আমার হাত তাঁর বগলে শত মানুষের ভিড়ে।


এভাবে চলতে চলতে একদিন দিন আর ফিড়ে আসেনা, পারস্য কন্যা আর আগের মতো হাসে না, দূরত্বকে তাঁর হঠাৎ ভয়, মনে সংশয়।
ভয়কে করলে ভয় ফলাফল পরাজয়।
অবশেষে একদিন দূরত্বেরই হলো জয়, আমার পরাজয়। 

মোট পুঁথি পাঠ