প্রবাস

“প্রবাস” শব্দের অর্থ হলো নিজ দেশ বা জন্মভূমি ছেড়ে অন্য দেশে বসবাস করা। তবে আমার জীবনের অভিজ্ঞতাটা একটু ভিন্ন।


পরবাস আমাকে আপন করেছে—

আপনবাস করেছে আমায় পর।


রক্তের সম্পর্ক দূরে সরে গেছে,

বহুকাল আগে বলে—“তুই দূরে সর”।


জন্মভূমিতে ছিলাম ভূমিহীন, গৃহহীন,

পরাশ্রয়ে কেটেছে শৈশব কৈশোর দিন।


শিখেছি– 

“রক্তের সম্পর্ক মানেই আত্মীয় নয়,

আত্মার সম্পর্ক যার সাথে সেই শুধু আত্মীয় হয়!”


পরবাসেই গড়েছি আমার ঘর–

ভালোবাসা আর ছোট্ট সংসার।

হিংহের মত মাথা উচুঁ করে বাঁচি,

সকল নাগরিকের সমঅধিকার।


জন্মভূমিতে ছিলাম গৃহহীন পথিক,

নামহীন, ঠিকানাহীন ক্লান্ত পর্যটক।

কিন্তু এই নিশীথ সূর্যের দেশে–

ঘর আলোকিত করে মেরুর আলোক।


আজব এই জীবন, আজব সব মানুষ—

পরই হলো আপন, আপন হলো পর।

অন্ধের দেশ ও আমাদের রাজনীতি


টাকের কাছে চিরুনি যেমন সম্পূর্ণ গুরুত্বহীন, তেমনি অন্ধের কাছে আয়নাও ততটাই অপ্রয়োজনীয়। আয়নাটি যতই উৎকৃষ্ট গুণাবলিসম্পন্ন হোক না কেন, দৃষ্টিহীন মানুষের কাছে তার কোনো কার্যকর মূল্য নেই। অন্ধের কাছে আয়নার চেয়ে বহুগুণ বেশি প্রয়োজনীয় একটি সাদা ছড়ি—যার সাহায্যে সে কারো কাঁধে ভর না দিয়েই নিরাপদে পথ চলতে পারে, রাস্তা পার হতে পারে এবং নিজের গন্তব্য খুঁজে নিতে পারে।

এই বাস্তবতা উপলব্ধি করলে সহজেই বোঝা যায়—যে দেশে অধিকাংশ মানুষ অন্ধ, সে দেশে আয়নার ব্যবসা কখনোই লাভজনক হতে পারে না। এই সত্যটি উপলব্ধি করতে পারলে কেউ কখনো অন্ধের দেশে আয়না বিক্রি করার কথা ভাববে না। কারণ—

প্রথমত, অন্ধের কাছে আয়নার কোনো ব্যবহারিক প্রয়োজন নেই।

দ্বিতীয়ত, আপনি যদি আয়নাটি বিক্রি না করে বিনামূল্যেও অন্ধকে প্রদান করেন, তবুও আপনার উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। মানুষ আপনার নিয়তকে সন্দেহের চোখে দেখবে এবং আপনাকে প্রতারক কিংবা ধূর্ত হিসেবে আখ্যায়িত করবে। তারা বলবে—যে জানে অন্ধ চোখে দেখে না, সে জেনেশুনেই তাকে ধোঁকা দেওয়ার উদ্দেশ্যে আয়না হাতে তুলে দিয়েছে।

তৃতীয়ত, ধরুন—আপনার মহৎ উদ্দেশ্য বুঝে কিংবা অন্য কোনো কারণে অন্ধ ব্যক্তি আয়নাটি গ্রহণ করল। কিন্তু দৃষ্টিহীনতার কারণে অসাবধানতাবশত আয়নাটি ভেঙে সে আহত হলো। তখন আপনার দেওয়া আয়নার ভাঙা কাচই প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হবে আপনাকে অপরাধী সাব্যস্ত করার জন্য। অভিযোগ উঠবে—আপনি সুপরিকল্পিতভাবে আয়নাটি দিয়েছেন, যাতে কাচ ভেঙে দুর্ঘটনায় অন্ধের মৃত্যু ঘটে এবং আপনি দায় এড়িয়ে যেতে পারেন।

অতএব, কোনো অবস্থাতেই—মনেও—অন্ধের দেশে আয়না বিক্রি করার চিন্তা করা উচিত নয়।

এখন হয়তো মনে হতে পারে—“আমি কি উদ্যোক্তা হয়ে জন্মেছি থেমে যাওয়ার জন্য?” আয়না না হয় বিক্রি করা হলো না। অন্ধদের উপকারের উদ্দেশ্যে এবার সাদা ছড়ির ব্যবসা করা যাক—যাতে তারা এই ছড়ির সাহায্যে কারো ওপর নির্ভর না করেই স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে পারে।

ধরা যাক, আপনি অন্ধের দেশে আয়নার পরিবর্তে সাদা ছড়ি সরবরাহ করলেন। অল্প সময়েই আপনার বিক্রি করা ছড়ি সবার হাতে পৌঁছে গেল। কিন্তু হঠাৎ কোনো এক অন্ধ—ছড়ির ঝনঝনানি বা অন্য কোনো তুচ্ছ কারণে—মেজাজ হারিয়ে পাশের আরেক অন্ধের মাথায় আঘাত করল। আঘাতপ্রাপ্ত অন্ধটিও পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় তার ছড়ি দিয়ে আঘাত করল অন্যজনকে। এভাবে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছাল যে অন্ধের দেশের প্রতিটি অন্ধ একে অপরের বিরুদ্ধে সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ল।

বিশ্ববাসী তখন দেখল—অন্ধের দেশ গৃহযুদ্ধে লিপ্ত। বিষয়টি আন্তর্জাতিক আদালত পর্যন্ত গড়াল। সেই আদালতেই গৃহযুদ্ধের অস্ত্র হিসেবে আপনার সরবরাহ করা সাদা ছড়ি উপস্থাপন করা হলো।

তখন সেই ছড়ির ভগ্নাংশই প্রমাণ হিসেবে ব্যবহৃত হবে আপনাকে অপরাধী সাব্যস্ত করার জন্য। অভিযোগ উঠবে—আপনি সুপরিকল্পিতভাবে অন্ধদের হাতে এই ছড়ি তুলে দিয়েছেন, যাতে তারা পরস্পরের বিরুদ্ধে সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে এবং আপনি নেপথ্যে থেকেই দায়মুক্ত থাকেন।


অতএব, শিক্ষা একটাই—

মনের ভুলেও অন্ধের দেশে কোনো ধরনের ব্যবসায় জড়ানো উচিত নয়।

আরিফুর রহমানের বন্ধুত্ব বিষয়ক উক্তি সমূহ

জীবনে চলার পথে আরিফুর রহমানের  বন্ধু এবং বন্ধুত্ব বিষয়ক অভিজ্ঞতা এবং ভাবনা সমূহ নিম্নে তালিকা আকারে প্রকাশ করা হলো।

আরিফুর রহমানের বন্ধুত্ব বিষয়ক উক্তি সমূহ

১. মানুষ যখন বুদ্ধি বিবেকের পরিবর্তে আবেগ দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়ে কোন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে তখনই সে বেশি ভুল করে। তাই বন্ধু নির্বাচন বা ত্যাগে বিবেক বুদ্ধির দ্বারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত। 

২. বন্ধুত্বের ভিত্তি হলো নিঃস্বার্থ বিশ্বাস আর সহপাঠীর ভিত্তি হলো স্কুলের বেঞ্চ। এই স্কুলের বেঞ্চকে ভিত্তি করে কেউ কেউ বন্ধু হয়, কিন্তু সকলের নাম বন্ধু তালিকায় ওঠে না। 

৩. শৈশবে যে প্রিয় বন্ধু ছিলো না, বয়স্ককালে এসে যদি সে প্রিয় বন্ধু হওয়ার চেষ্টা করে তখন বুঝতে হবে তার মাঝে স্বার্থ লুকিয়ে আছে। 

৪. সহপাঠী মাত্রই বন্ধু নয়, আবার সব বন্ধু সহপাঠীও হয় না। কারণ সহপাঠী এবং বন্ধু দুটি ভিন্ন ভিন্ন বিষয়। 

৫. সুন্দর চেহারা আর সুন্দর মানুষ এক বিষয় নয়। তাই চেহারা দেখে বন্ধু নির্বাচন করা উচিত নয়। 

৬. যে বন্ধু তোমাকে বিশ্বাস করে এবং সত্যিকার অর্থে বন্ধু ভাবে সে কখনোই কান কথা শুনে তোমার পিঠে ছুরি চালাবে না। 

৭. প্রকৃত বন্ধুর পরিচয় বিপদে মেলে, সুসময়ে যে সকল ব্যক্তি বন্ধুত্ব করতে আসে, তাদের অধিকাংশই আপন স্বার্থে আসে। 

৮. বন্ধু নির্বাচনে সচেতন হওয়া উচিত, এবং স্বার্থপর ব্যক্তিদের সাথে বন্ধুত্ব করা কখনো উচিত নয়। কারণ স্বার্থপর ব্যক্তিরা সকলকে আপন স্বার্থেই ব্যবহার করে থাকে। 

৯. অন্ধ বিশ্বাসী উগ্র ধার্মিক করোনা ভাইরাসের চেয়েও ক্ষতিকর। যদি সে বন্ধুও হয় তার থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখো। 

১০. কাউকে হঠাত করে বন্ধু ভেবে গোপন কথা বলা উচিত নয়, অসময়ে সেই কথা সে তোমাকে ঘায়েল করতেই ব্যবহার করবে। 

১১. প্রকৃত বন্ধুত্ব হলো ওয়াইফাই সংযোগের মত, নির্দিষ্ট সীমায় আসলে তা আপনা আপনি সংযোগ প্রাপ্ত হয়। 

১২. ঋতু বদলের সাথে সাথে যেমন প্রকৃতির রঙ বদলায়, অনুরূপ সময়ের সাথে সাথে বন্ধুত্বেরও রূপ বদলায়। 

১৩. অধিকাংশ শত্রুতা বন্ধুত্ব থেকেই হয়, তাই কাউকে বন্ধু ভেবে স্পর্শকাতর গোপন বিষয় জানানোর পূর্বে দ্বিতীয়বার ভাবা উচিত। 

১৪. উগ্র ধার্মিকের ধর্মীয় অনুভূতির কাছে বন্ধুত্ব অতি তুচ্ছ। তার কাছে ধর্মীয় অনুভূতি রক্ষায় বন্ধুত্ব বিসর্জনের বস্তু। 

১৫. ধর্মান্ধ জঙ্গীপন্থী বন্ধুর অপেক্ষা বিষাক্ত সাপ উত্তম।

১৬. যার শুরু আছে তার শেষ আছে, বন্ধুত্ব এর ব্যতিক্রম নয়।

এক বাঙালির গল্প

আমার দাদা-দাদী যখন জন্মগ্রহণ করেছিলেন,
তখন জন্মসূত্রে তারা ছিলেন ব্রিটিশ ভারতীয় নাগরিক।
কারণ সে সময়ে আমাদের বঙ্গভূমি ভারতবর্ষের অংশ ছিল,
আর ভারত তখন ব্রিটিশদের উপনিবেশ ছিল।


আমার বাবা-মা যখন জন্মগ্রহণ করেছিলেন,
তখন জন্মসূত্রে তারা ছিলেন পাকিস্তানি নাগরিক।
কারণ সে সময়ে আমাদের বঙ্গভূমি পাকিস্তানের অংশ ছিল,
এবং বাংলাদেশ তখন পাকিস্তানের উপনিবেশ ছিল।


আমি যখন জন্মগ্রহণ করেছিলাম,
জন্মসূত্রে আমি  তখন একজন বাংলাদেশী নাগরিক ছিলাম।
কারণ আমরা তখন স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র ছিলাম।
এটি আমার গল্প, আমাদের গল্প।

আমাদের পরবর্তী প্রজন্ম গল্পটাকে সম্প্রসারিত করবে,
তাঁরা আমার না বলা অংশটুকু বলবে,
এবং গল্প অবিরত থাকবে।


পাদটীকা: সময়ের সাথে কচুরিপানার মত মানুষের পরিচয় বদলে যায়, এর আদি নিবাস দক্ষিণ আমেরিকা হলেও বাংলাদেশের কমবেশি সব অঞ্চলের জলাশয়ের এর দেখা মেলে। কচুরিপানা এখন বাংলার জলজ উদ্ভিদ। 

আরিফুর রহমান 
দ্রব্যাক, নরওয়ে


উল্লেখ্য: নরওয়ের নাগরিকত্ব পাওয়ার পর কবিতাটি ২৫ জুন ২০১৮ সালে লেখা। প্রথম প্রকাশ হয়েছিল আমার ব্লগে। 

ভালো লাগা এবং ভালোবাসা

ভালো লাগা এবং ভালোবাসা শব্দ দুটো “ভালো” দিয়ে শুরু হলেও এর অর্থ কিন্তু এক নয়। শব্দ দুটি সম্পূর্ণ পৃথক এবং ভিন্ন অর্থকে নির্দেশ করে।
কেউ কেউ বলে থাকে প্রথম দেখায় ভালোবাসা হয়, আমি এই বিষয়ে সম্পূর্ণ দ্বিমত। আমি মনে করি প্রথম দেখায় যেটা হয় সেটা হলো ভালো লাগা, মুগ্ধতা বা আকর্ষণ, তা ভালোবাসা নয়।

ফুল এবং ফল এক বিষয় নয়, ফুল হলো ফলের পূর্ণতার কারণ, ফুল হলো ফলের ভিত্তি, তবে তা একটি নিদিষ্ট প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই ফলে রূপ লাভ করে থাকে।
আমরা জানি ফুল থেকেই ফল হয়, এবং যে গাছে ফুল আসে না সে গাছে ফল আসে না। কোন কোন গাছে ফুল আসলেও সব ফুল আবার ফলে পরিণত হতে পারে না, পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে কোন কোন ফুল অকালেই ঝরে যায়, ফলে রূপ পেলেও বিকশিত হওয়ার আগেই তা ঝরে যায়। এ ক্ষেত্রে বলা যেতে পারে ফুল থেকে ফলে পূর্ণতা পাওয়ার সৌভাগ্য সব ফুলের হয় না। এখানে ভালো লাগা হলো ফুল স্বরূপ, এবং ভালোবাসা হলো ফল স্বরূপ।

আমরা অনেক সুবর্ণ এবং সুগন্ধময় ফুল দেখে থাকি যা প্রথম মূহূর্তেই আমাদের চিত্তকে আকর্ষণ করে, আনন্দিত করে বা ভালো লাগে, এ ক্ষেত্রে সেটি প্রথম দেখায় ভালো লাগা, মোটেও প্রথম দেখায় ভালোবাসা নয়।
দুধ একটি নিদিষ্ট প্রক্রিয়া এবং সময়েই তা দইয়ে পরিণত হয়, অনুরূপ ভালো লাগা থেকে ভালোবাসার বেলাতেও তাই।

ব্যক্তি বা বস্তুর বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণে আমাদের মনে ভালো লাগা বা আকর্ষণ সৃষ্টি হয়, ক্রমান্বয়ে তা ভালোবাসায় রূপ ধারণ করে। ভালোবাসা হলো নিদিষ্ট প্রক্রিয়ায় ভালো লাগার ক্রমবিকাশের ফল।

কোন নিদিষ্ট ব্যক্তি বা বিষয় সুশ্রী হলে তাতে মানুষের মনে ভালো লাগার আকুলতা সৃষ্টি হয়, পাশাপাশি উক্ত ব্যক্তি বা বিষয়ে যদি মনে ভয় বা আতংক অবস্থান করে, এক্ষেত্রে উক্ত ব্যক্তি বা বিষয়ের সাথে ভালোবাসা প্রতিষ্ঠা পায় না। অর্থাৎ মানুষ তাকেই ভালোবাসে যাকে সে ভয়হীন বিশ্বাসভাজন বন্ধু এবং প্রিয়জন মনে করে।


বাগানের কোন ফুলে সৌন্দর্যে আকৃষ্ট হওয়ার পর ব্যক্তি যখন সেটাকে গাছ থেকে ছিঁড়ে ঘরে এনে ফুলদানীতে সাজিয়ে রাখে, ব্যক্তির এহেন কর্মকান্ড তখন ফুলের প্রতি ব্যক্তির ভালো লাগার বা মুগ্ধতার প্রকাশ ঘটায়।
ফুলটাকে তার শাখা থেকে বিচ্ছিন্ন করলে একটা সময় শেষে সেটি মারা যাবে, এই ভেবে বা ফুলের স্বার্থের কথা ভেবে যখন বাগানেই রেখে ফুলের প্রতি আরো বেশি যত্নবান হয় তখন ব্যক্তির কর্মকান্ড ফুলের প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ ঘটায়।

ভালো লাগা হলো ব্যক্তির আত্ম কেন্দ্রীক অনুভূতি, এবং ভালোবাসা হলো ব্যক্তির মনে বস্তুর স্বার্থ কেন্দ্রীক অনুভূতি।

মানুষ যে ব্যক্তি বা বস্তু-কে প্রকৃতার্থেই ভালোবাসে, মানুষ তাকে সচেতনে বা সেচ্ছায় কষ্ট দিতে পারে না বা তার ক্ষতির কারণ হতে পারে না। ভালোবাসা মানুষকে দ্বায়িত্বশীল হতে শেখায়, ভালোবাসা ব্যক্তি বা বস্তুকে যত্ন এবং সম্মান করতে শেখায়।

আরিফুর রহমান, দ্রবাক, নরওয়ে।

মূল্যায়ন এবং বিশ্বাস যোগ্যতা; আরিফুর রহমানের সংলাপ: ২

"মার্কিন রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্প পৃথিবী থেকে পায়ে হেঁটে চাঁদে গিয়েছিলেন।" বাক্যটি পড়ার পর এর সত্যতা নিয়ে আমাদের মনে নানা রকম প্রশ্নের উদয় হতে পারে। এবং, হওয়াটাই স্বাভাবিক।
এক পক্ষ বিষয়টিকে হয়তো এভাবে বিবেচনা করতে পারে, "হ্যাঁ, এটি সম্ভব, কারণ তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্প, মার্কিন রাষ্ট্রপতি, বিপুল অর্থ সম্পদের মালিক, ব্যাপক ক্ষমতা তার, ট্রাম্পের পক্ষে সব কিছুই করা সম্ভব।"
অপরপক্ষ বিষয়টির সত্যতা নিয়ে এভাবে মন্তব্য করতে পারে, "ভুয়া কথা, এ কখনো হয় নাকি? পৃথিবী থেকে চাঁদের কি হেটে যাওয়া যায়? পৃথিবী থেকে চাঁদে কি সাঁকো লাগানো আছে? যত সব আজগুবি কথা।"
রাতের আকাশ
ছবি: গ্রেগ রাকোজি

তবে, এই লেখায় প্রথম বাক্যটি নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য না করে, বাস্তবতার নিরিখে অন্য ভাবে বিশ্লেষণ করি চলুন।


সত্য সন্ধান; আরিফুর রহমানের সংলাপ: ১

ডাইনোসর কত বছর আগে পৃথিবীতে বিচরণ করত, এবং কিভাবে তারা বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল তা বোঝার জন্য, তথাকথিত কোন সাক্ষীর জবানবন্দীকে প্রমাণ হিসেবে ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রয়োজন হয় না।। ডাইনোসরের জীবাশ্ম নিয়ে গবেষণা করলেই সঠিক সত্য পাওয়া যায়।
অনুরূপ, কোন কোন বিষয়ের সত্যতা যাচাই করার জন্য সর্বদা সাক্ষী প্রমাণের দরকার হয় না। আশেপাশে জীবাশ্মর মত ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা তথ্য উপাত্ত নিয়ে, সরল যোগ বিয়োগ অংকের নিয়মে হিসাব নিকাশ করলেই সত্য উপলব্ধি করা যায়। সত্যকে উপলব্ধি করার জন্য সর্বদা প্রত্নতাত্বিক হওয়ার প্রয়োজন নাই।

ডাইনোসর
চিত্রে ডাইনোসর, স্টিফেন লিওনার্দি'র চিত্র। 
আরো পড়ুন: মূল্যায়ন এবং বিশ্বাস যোগ্যতা, আরিফুর রহমানের সংলাপ: ২

স্বীকৃতি; কথার কথা - ২

আমার জীবনে আর্বিতিত হওয়া বিভিন্ন অভিজ্ঞতার আলোকে “কথার কথা” নামে বিভিন্ন কথা নিয়ে একটি ধারাবাহিক কথামালা রচনার উদ্যোগ নিয়েছি। নিম্নে তারই একটি তুলনামূলক নমুনা উল্লেখ করা হলো।


মূল কথা:
“যাহা বলিব সত্য বলিব, সত্য বৈ মিথ্যা বলিব না। মহামান্য আদালত, কাঠগড়ার অপর পাশে বাদীপক্ষ আমার কেউ নন। আর আপনি যে ছেলে-মেয়ের ভরণ পোষণ দেয়ার কথা বলছেন, ঐ ছেলে-মেয়ের পিতা আমি নই। যে ছেলে-মেয়েকে আমি নিজের সন্তান মনে করি না, তাদের আমি ভরণ পোষণের খরচ দেবো কেন? ঐ রকম ছেলে-মেয়ে রাস্তা ঘাটে পাওয়া যায়। হুজুর, আমি চাকুরীর কারণে বাড়িতে থাকি না, দুই তিন মাস পর বাড়িতে আসি কি আসি না, তার কোন ঠিক নাই। আমার অনুপস্থিতিতে ঐ চরিত্রহীন মহিলা কাকে দিয়ে ঐ সন্তান দুটো জন্মাইছে তা আমি বলতে পারি না, ঐ ছেলে-মেয়ে যেহেতু আমার না, তাই আমি তার ভরণ পোষণ বাবদ কোন টাকা পয়সা দিতে পারবো না।”

কথাটি এমনও হতে পারতো-
“যাহা বলিব সত্য বলিব, সত্য বৈ মিথ্যা বলিব না এবং সত্যকে অস্বীকার করিব না। মহামান্য আদালত, কাঠগড়ার অপর পাশে বাদী হিসেবে যে মহিলা এবং দুই ছেলে মেয়েকে দেখতে পাচ্ছেন, তারা আমার পরিবার। আপনি যে ছেলে-মেয়ের ভরণ পোষণ দেয়ার কথা বলছেন, তারা আমারই সন্তান। রাস্তা ঘাটে ওদের বয়সী কোন ছেলে-মেয়েকে দেখলেই ওদের কথা আমার মনে পরে। হুজুর, আমি চাকুরীর কারণে বাড়িতে থাকি না, স্ত্রী সন্তানের মুখ দেখতে দুই তিন মাস পরপর ব্যকুল হয়ে বাড়িতে আসি। তবে আমার অনুপস্থিতিতে আমার স্ত্রী যেভাবে আমার সংন্তান এবং সংসারের খেয়াল রাখে তা দেখে আমি মুগ্ধ, আবিভূত। আমার স্ত্রী এবং সন্তানদের ভরণ পোষণের খরচ দেয়া এবং তাদের প্রতি যত্নবান হওয়া, একজন স্বামী এবং পিতা হিসেবে আমার নৈতিক দ্বায়িত্ব।” 

পুনঃশ্চ, মূল কথাগুলোর বক্তা কে ছিলো তা এখানে আলোচ্য বিষয নয়, মূল কথার ভাবার্থই এখানে মূখ্য আলোচ্য বিষয়। তবে কথাগুলোকে আসমানী কথা বা আকাশ কুসুম কল্পনা ভেবে এড়িয়ে যাওয়াই আপনার জন্য উচিত হবে। কারণ কথাগুলো লেখার সময় আমি বিমানে অবস্থান করছিলাম, এবং বিমান তখন আকাশে উড্ডীয়মান ছিলো।

আরিফুর রহমান
০২.০৯.২০১৯
পোল্যান্ড - নরওয়ে আকাশ পথে

আরো পড়ুন:  আত্মীয়তা; কথার কথা - ১

আত্মীয়তা; কথার কথা - ১

আমার জীবনে আবর্তিত হওয়া বিভিন্ন অভিজ্ঞতার আলোকে “কথার কথা” নামে বিভিন্ন কথা নিয়ে একটি ধারাবাহিক কথামালা রচনার উদ্যোগ নিয়েছি। নিম্নে তারই একটি তুলনামূলক নমুনা উল্লেখ করা হলো।


মূল কথা: 
 “তুমি আইজ যত বড়-ই হও, যতই দেশ বিদেশ ঘুরে বেড়াও, যত টাকার মালিক-ই হও, ভুলে যাইয়ো না, এক কালে গ্রামে থাকতে, আমাদের ছাগল ভেড়া চড়াইচেও, আর শহরে থাকতে আমাদের বাজারের ব্যাগ টানিচেও।” - এ কথা তাচ্ছিল্যের, এ কথা অনাত্মীয়তার।

 কথাটি এমনও হতে পারতো- 
“তুমি আজ যত বড়-ই হও, পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকো না কেন, একটা কথা মনে রেখো, আমাদের দোয়া এবং শুভ কামনা সব সময় তোমার সঙ্গে আছে, তুমি সব সময় সুন্দর এবং নিরাপদে থাকো এটাই আমাদের কামনা।” - এ কথা আন্তরিকতার, এ কথা আত্মীয়তার।

 পুনঃশ্চ, মূল কথাগুলোর বক্তা কে ছিলো তা এখানে আলোচ্য বিষয নয়, মূল কথার ভাবার্থই এখানে মূখ্য আলোচ্য বিষয়। তবে কথাগুলোকে আসমানী কথা বা আকাশ কুসুম কল্পনা ভেবে এড়িয়ে যাওয়াই আপনার জন্য উচিত হবে। কারণ কথাগুলো লেখার সময় আমি বিমানে অবস্থান করছিলাম, এবং বিমান তখন আকাশে উড্ডীয়মান ছিলো।

আরিফুর রহমান
২৮.০৮.২০১৯
নরওয়ে - পোল্যান্ড আকাশ পথে

আরো পড়ুন:  স্বীকৃতি; কথার কথা - ২

বাংলা ভাষা

বাংলা এমন একটি ভাষা,
যে ভাষা বক্তাকে দেয় স্বাধীনতা;
ভাব প্রকাশের,
ব্যাক্য গঠনের,
শব্দ চয়নের।
যথা: “আমি ভাত খাই।
খাই আমি ভাত।
আমি খাই ভাত।
ভাত আমি খাই”।
সকলই সঠিক বাক্য ভাব প্রকাশে।

বাংলা এমন একটি ভাষা,
যে ভাষায় লিঙ্গ বৈষ্যম্য বিলীন।
নারী ও পুরুষ কন্ঠে কন্ঠ মিলিয়ে
একই বাক্যে বলতে পারে;
আমি তোমায় ভালোবাসি।
আমি তোমায় ভালোবাসি।

বাংলা এমন একটি ভাষা,
যে ভাষায় মানুষ প্রকাশ করে
সম্মান, ভালোবাসা, স্নেহ;
আপনি, তুমি, তুই
আবেগ ও সম্পর্কের অনুপাতে।

বাংলা পৃথিবীর সহজতম ভাষা,
এ ভাষা বাঙালির ঐতিহ্য,
আবেগ প্রকাশের পরিভাষা।

অনুকরণীয় অনুসরণীয়

সকলেই অনুকরণীয় হয় না।  মানুষ সবাইকে অনুকরণ বা অনুসরণ করে না। অনুকরণীয় বা অনুসরণীয় হবার মতো যোগ্যতা বা গুণাবলী রয়েছে মানুষ কেবল তাদেরকেই অনুসরণ করে।

বাল্যকালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃজনশীল, শৈল্পিক গুণাবলী সমূহ আমাকে মুগ্ধ, অনুপ্রাণিত এবং প্রভাবিত করেছিল।
শব্দে শব্দ গেঁথে কবিতা লিখতে শুরু করেছিলাম, কিছু গল্প লিখেছিলাম, যদিও এ সকলই বাল্যকালের কথা, পাণ্ডুলিপি গুলো হারিয়ে গেছে সেই কবে কালের স্রোতে।  রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে আঁকা ছবি দেখে প্রথম উপলব্ধি করেছিলাম ছবি আঁকা খুব সোজা, ছবি আঁকায় ভুল বলে কিছু নাই।
তবে আমি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে অনুকরণ বা অনুসরণ করিনি, আমি শুধু তার মতো সৃজনশীল গুণাবলী সমূহ আত্মস্থ করার চেষ্টা করেছিলাম যা আমায় মুগ্ধ করেছিল। আমিও ছবি আঁকি, আমিও কবিতা লিখি এর মানে আমি তাকে অনুকরণ বা অনুসরণ করি।  আমি নিশ্চিত বলতে পারি আমার মতো আরো অনেকেই আছে যারা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সৃজনশীল গুণাবলীর দ্বারা প্রভাবিত।
আমার আঁকা ছবি, আমার কবিতা বা লেখা আমার ভাবনা আর চিন্তা চেতনা আমার মত করে আমার ভাষায় প্রকাশ করি এটাই আমার মৌলিকত্ব।

বাল্যকালে মোনালিসা পেইন্টিংটাকে একটা স্থির আলোকচিত্র ভাবতাম। কৈশোরে এসে যখন জানলাম এটি স্থির আলোকচিত্র নয় প্রকৃত পক্ষে এটি লিওনার্দো দা ভিঞ্চির আঁকা একটি তৈলচিত্র। তখন আমি খুব অবাক হয়েছিলাম এই ভেবে যে একজন মানুষের পক্ষে কিভাবে এতো নিখুঁত এবং প্রাণবন্তভাবে একজন মানুষের প্রতিকৃতি আঁকতে পারে!?
এরপর আমি প্রতিকৃতি আঁকতে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। সে সময় দিনরাত ছবি আঁকতাম, ছবি আঁকা ছিল আমার একমাত্র নেশা। সে সময় প্রায় শতাধিক প্রতিকৃতি ক্যানভাসে বা রংতুলিতে এঁকেছিলাম।

যৌবনে এসে শ্রদ্ধেয় শিশির ভট্টাচার্যের আঁকার ধরণ এবং কার্টুন বা ক্যারিকেচারের প্রান্তরেখা (আউটলাইন) দেখে মুগ্ধ হয়েছিলাম। তখন কলম ছিলো আমার কার্টুন আঁকার একমাত্র হাতিয়ার, তাই তার মতো করে প্রান্তরেখা আঁকার চেষ্টা করতাম। শিশির ভট্টাচার্যের চৌকষ এবং পেশাদারী অঙ্কন শৈলী আমার সবচেয়ে প্রিয়।

ঐ একই সময় মামুন হোসাইন ভাইয়ার আঁকা কার্টুন দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছিলাম। তার আঁকা চরিত্রগুলির অভিব্যক্তি এবং উপস্থাপন দেখে মনে হয়েছিল কার্টুন আঁকা খুবই সোজা।
শুরুর দিকে মামুন হোসাইনের আঁকার ধরণ অনুসরণ করার চেষ্টা করতাম। পরে অবশ্য আমার মতো করে আঁকতে শুরু করি এবং নিজস্ব আঁকার ধরণ দাঁড় করি। 

আমি মনে করি প্রতিটি মানুষের বিশেষ গুণাবলী রয়েছে যা কাউকে না কাউকে মুগ্ধ করে।
কখনো যদি শুনি আমাকে কেউ আমার বিশেষ গুণাবলীর জন্য অনুকরণ বা অনুসরণ করে তাহলে আমি খুশি হই এই ভেবে যে একজন মানুষকে দেয়ার মতো বা অনুপ্রাণিত করার মতো আমার কিছু আছে।
অনুকরণীয় অনুসরণীয়
ছবি: জেহুন সুং

মুহূর্তের আলিঙ্গনে

বছর খানেকের তরে আমি ভুলে যেতে চাই,
কে আমি, কোথায় ছিলাম, কোথায় এলাম,
কি হারালাম, কি পেলাম,
কোনটা নামি, কোনটা দামি।

উদাসীন আমি, ভাবনা ছিল কম জীবন, ভবিষৎ প্রসঙ্গে
অল্পতেই ছিলাম তুষ্ট, সন্তুষ্ট।
চলতাম সময় স্রোতে বেহুঁশে গা ভাসিয়ে।
ঋতুর পরে ঋতু এসে চলে গেছে, আমি থেকেছি
সকল প্রহরে একই ঘরে, একই তরে, বেখেয়ালিতে।
বিচ্ছিন্ন ছিলাম, ছিলাম বাস্তবতা থেকে অনেক দূরে।
ছিলাম আমার পথে একা,
অচেনা সে পথে বসন্ত দেয়নি দেখা।
হিমেল হাওয়া দিয়েছে দোলা,
নিযুত বছর ধরে যেভাবে দিয়ে চলেছে
সবার চুলে, সবার গালে।

যে মুহূর্ত চলে গেছে সে তো আর আসবে না,
হয়তো আসবে নতুন মুহূর্ত, হয়তো সেটি হবে উত্তম
অথবা অন্য রকম।
আমি প্রস্তুত নতুন মুহূর্তকে আলিঙ্গন করতে।

মুহূর্তের আলিঙ্গনে
ছবি: মার্কো বিয়ানচেটি

শৈশবের নীতি কথা

পরিশ্রমে ধন আনে
পূন্যে আনে সুখ।
আলস্য দারিদ্র্য আনে
পাপে আনে দুঃখ।
উপরের কথা গুলো আমার নয়, আমার নানী প্রায়ই কথা গুলো বলতেন এবং নানীর ঘরের দেয়ালে লিখে বাঁধানো ছিলো। কথা গুলোর রচয়িতা আমার অজ্ঞাত। তবে কথাগুলো যারই রচিত হোক না কেন, কথা গুলো সার্বজনীন অর্থবহ চিরন্তন সত্য কথা।
আমার শৈশবে নানীর মুখে ছন্দময় আরো অনেক কথাই শুনেছি। তাঁর সকল কথার অর্থ আমি তখন বুঝতাম না তবে এখন সব কিছুই বুঝতে পারি। নানীর মুখে শোনা উপরের কথা গুলোকে আমি জীবন দর্শন মনে করি।

দূরত্ব

একটা সময় ছিল যখন পারস্যের কন্যার সাথে প্রণয় ছিল। যদিও দুজন ছিলাম দুই মহাদেশের বাসিন্দা, দূরত্বের কাছে মাথা নোয়াবার নই; এমনি ছিল মনোবল। একে অন্যের সাথে দেখা করার জন্য সকল বাঁধা পাহাড় পর্বত ডিঙিয়ে, দূরত্বকে পিছনে ফেলে নয়নে নয়ন মেলাতে বছরে দুই একবার পাড়ি জমাতাম দুই মহাদেশের মিলন স্থলে, তুরস্কে।
দুজন একসাথে, আমার হাত তাঁর বগলে, একসাথে  ঘুরতাম - বেড়াতাম ইস্তানবুল, আন্তালিয়ার পথে প্রান্তরে, নীল আকাশের নিচে, সাগর তীরে, অরণ্যে - লোকালয়ে, রাস্তায় মানুষের ভিড়ে, পারস্য কন্যা আমার হাত ছাড়তোনা কখনোই।
পাথরের আসনে দুজনে মুখোমুখি বসে জোস্না রাতে, হাতে হাত রেখে পূর্ণিমা দর্শন, জোস্নায় স্নান। ভূমধ্যসাগরের জল চিকচিক করতো চন্দ্র আলোয়, হাওয়ার আবেশে, দুইজন দর্শক
আমি আর সে, অনুভূতিরা গভীর হতো রাতের সাথে।

বিদায় বেলায় তাঁর মাথা আমার কাঁধে, ভিজতো গাল তাঁর নয়ন জলে তবু ঠোঁটে হাসি কথার ছলে, যেতে হবে ছেড়ে তবু মন বাঁধ সাধে, আমি সান্তনা দিতাম; আবার দেখা হবে বছর গড়ালে।
হাওয়াই জাহাজ উড়াল দিতো, হয়ে যেত সে মেঘের আড়ালে, চোখের আড়ালে।

বাড়ি ফিড়ে শুরু হতো আবার দুজনের দিন গোনা। দিন গুনতে গুনতে, একদিন দিন আবার আসতো ফিড়ে, দুজনে মিলতাম, হাতে হাত রাখতাম সাগর তীরে, চাঁদনী রাতে, আমার হাত তাঁর বগলে শত মানুষের ভিড়ে।


এভাবে চলতে চলতে একদিন দিন আর ফিড়ে আসেনা, পারস্য কন্যা আর আগের মতো হাসে না, দূরত্বকে তাঁর হঠাৎ ভয়, মনে সংশয়।
ভয়কে করলে ভয় ফলাফল পরাজয়।
অবশেষে একদিন দূরত্বেরই হলো জয়, আমার পরাজয়। 

শৈশব এবং স্নো

ইন্টারনেটে ছবিটা খুঁজে পেলাম। ছবিটা দেখা মাত্র কিছুক্ষণের জন্য আমি শৈশবে ফিরে গিয়েছিলাম। আমার সেই হারিয়ে যাওয়া শৈশবে।

আমাদের তখন বাড়ী ছিলো। ঘরে গোল কাঁচের ড্রেসিং টেবিল ছিলো। ড্রেসিং টেবিলের এক পাশে সাজানো থাকতো চুড়িদানী। সেই চুড়িদানীতে আমার মায়ের হাতের বিভিন্ন রকমের চুড়ি সাজানো থাকতো, রঙ-বেরঙের কাঁচের চুড়ি, বেদের চুড়ি। মা সেগুলো বিশেষ উপলক্ষ্য ছাড়া হাতে পরতেন না। আমি চুড়ি গুলো নেড়েচেড়ে দেখতাম আর ঝনঝন শব্দ শুনতাম এরপর যেমনটা ছিলো ঠিক তেমনটি করে সাজিয়ে রেখে দিতাম।
সেই ড্রেসিং টেবিলের অন্যপাশে আমি জীবনে প্রথমবারের মত এই স্নোর প্যকেটটি দেখেছিলাম। আমি তখনও লিখতে পড়তে শিখিনি, তাই প্যাকেটের গায়ে কি লেখাছিল তা সে সময় আমি বুঝতাম না। প্যাকেটা কেবল হাতে নিয়ে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখতাম; একপাশে সুন্দরী এক রমনীর ছবি অন্যপাশে অট্টালিকা, দেবদারু গাছের মত গাছ, আর উচু সাদা কিছু একটা হবে। সব চিন্তাম কিন্তু সাদা অংশটা কি তখন তা বুঝতাম না। মা কে জিজ্ঞাসা করার পর মা বলেছিলেন সাদা অংশটা হল পর্বত যা স্নো পরার কারণে সাদা হয়ে গেছে।

শৈশবে স্নো বলতে বুঝতাম সেই ছোট্ট কৌটার সাদা পদার্থ, যা আঙুলে নিয়ে গালে মেখে মা রূপ চর্চা করতেন এবং আমার গালে মেখে দিতেন।

সময়ের সাথে সাথে স্নোর সজ্ঞা আমার কাছে পাল্টে গেছে।
এখন আমার আকাশ হতে প্রায়শই সকাল বিকাল স্নো ঝরে। এ স্নো ঠান্ডা, হিম শীতল। এ স্নোতে সুবাস নেই, কেউ গালে মেখে রূপ চর্চা করে না।

গোঁফ ভ্রম


কিছু দিন আগে হঠাৎ করে গোঁফ রেখেছিলাম।

গোঁফের কারনে প্রথম দেখাতেই অনেকে আমাকে দক্ষিণ ভারতীয় তামিল নয়তো শ্রীলঙ্কান ভেবে বসে থাকতো।

এমনটাই হয়েছিলো বেশ কদিন আগে নরওয়েজিয়ান শিল্পীদের সাথে বড় দিনের মধ্যাহ্ন ভোজের অনুষ্ঠানে।

আমার পাশে বসা এক শিল্পী আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন, কোথায় থাকেন? জবাবে বললাম দ্রবাক।

তিনি বললেন দ্রবাক সুন্দর শহর, কার্টুনিষ্টদের শহর, কার্টুনিষ্ট গ্যালারী আছে, বাংলাদেশী এক কার্টুনিষ্ট আছে যিনি নিজ দেশে কার্টুন এঁকে জেল খেটেছিলেন, নির্যাতিত হয়েছিলেন তিনিও আপনার মত দ্রবাকেই থাকেন।

আমি মুচকি হেসে জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি ঐ কার্টুনিষ্টকে চেনেন?

তিনি জবাবে বললেন, না কখনো দেখা হয়নি তবে তার সম্পর্কে পত্রিকায় পড়েছি।

আমি মুচকি হেসে বললাম, আচ্ছা।

আমাকে মুচকি মুচকি হাসতে দেখে, তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, আপনি কি তাকে চেনেন? মানে, ঐ বাংলাদেশি কার্টুনিষ্ট কি আপনার বন্ধু?

আমি বললাম, জ্বি না, তিনি আমার বন্ধু নন, আমিই তিনি।

আমার জবাব শুনে তিনি নড়েচড়ে বসলেন এবং উচ্চ স্বরে হাসতে হাসতে বললেন, সত্ত্যি! আপনিই সেই কার্টুনিষ্ট?

উনার অট্ট হাসির কারনে পাশে যারা বসেছিলেন তারা কথোপকথন থামিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন, ঘটনা কি?! এতো হাসির কি হলো?

তখন তিনি হাসি থামিয়ে, আমাকে দেখিয়ে বললেন, আমি এর কাছে এর গল্পই করছিলাম। এবং তাদেরকে আমার সম্পর্কে বিস্তারিত বললেন।

পরে তিনি আমাকে জানিয়েছিলেন যে, প্রথমে আমাকে দেখে দক্ষিণ ভারতীয় তামিল বা শ্রীলঙ্কান ভেবেছিলেন।

বদলায় সব কিছু

বদলায় নদীর স্রোত গতি পথ;
বদলায় মানুষ, সৎ-অসৎ।
বদলায় রাজা, বদলায় রানী;
সাগর সম নদী শুকায়, হারায় পানি।
নাচে নাচে তাল বদলায়, গানে গানে সুর।
ফিকে রঙে হয়ে যায়, স্মৃতি সুমধুর।
ঋতুরা বদলায়, ঝরে যায় পাতা।
কবিতারা ডানা মেলে, শূন্য খাতা।
সম্পর্ক বদলায়, বদলায় কথা;
বদলায় মানুষের নৈতিকতা।


কালকে যে আপন, আজকে সে নয়;
পান শেষে ভরা কলস, শূন্য পরে রয়।
গল্প শেষ হয়, উল্টালে পাতা;
ভালোবাসা শেষ হয়, ফুরালে কথা।


সময়ের সাথে বদলে যায় সব কিছু,
পৃথিবীর কোন কিছু চিরস্থায়ী নয়।


ছবি: ক্রিস লটন

ঠাকুরবাড়ির ধূলি

১৯৯৩ সাল, শাহজাদপুর শহরে আমি নবাগত। ক্লাস ফাইভে সদ্য ভর্তি হয়েছি স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়ের পাশেই মামার বাসা ছিল।

এর কিছুদিন পর গ্রাম থেকে আমার প্রাণপ্রিয়া নানী আসলেন আমাকে দেখতে। আমি যখন গ্রামে নানীর বাড়িতে থাকতাম তখন নানীর আঁচল ছিল আমার সব কিছু। সে যেখানে যেতো, আমিও তার আঁচল ধরে সেখানেই যেতাম। তো যাই হোক নানী এসেছেন আমাকে শাহজাদপুর শহর ঘুরে দেখতে। সবার প্রথমে তিনি আমাকে রবি ঠাকুরের কাচারী বাড়ি দেখবেন। তো আমি আর নানী রওনা হয়েছি, নানীর আঁচল ধরে হাটছি। নানী বলছিলেন, ''সেই অনেক আগের কথা, ঠাকুরেরা ছিল এই এলাকার জমিদার। একবার রবি ঠাকুর এর নৌকো আমার নানা বাড়ির ঘাটে ভিড়িয়ে ছিলো। আমার মা তখন ছোট্ট বালিকা। তিনি নিজ হাতে বকুল ফুলের মালা গেঁথে রবি ঠাকুরকে উপহার দিয়েছিলেন।''


তিনি আরো বলছিলেন, ''রবি ঠাকুর এই শাজাদপুরের মাটিতে বসে অনেক গান, কবিতা, গল্প রচনা করেছেন। যেমন, আমাদের ছোট নদী, তাল গাছ একপায়ে দাঁড়িয়ে, পোস্টমাস্টার, কীর্তি, ছুটি, সমাপ্তি, ইত্যাদি। রবি ঠাকুর আমাদের বিশ্ব কবি। আমাদের জাতীয় সংগীত তাঁর লেখা। সারা বিশ্ব চেনে তাঁকে এক নামে।''
শুনে গর্বে আমার চোখ ছলছল করতে লাগলো।
নানীর সাথে রবি ঠাকুরের কাচারী বাড়ি ঘুরে ঘুরে দেখলাম, নিজ হাতে লেখা বিভিন্ন পাণ্ডুলিপির নমুনা, তাঁর আঁকা চিত্রকর্ম। আরো দেখলাম তাঁর ব্যবহৃত পালঙ্ক, সোফা, আলনা, আয়না, আরাম কেদারা, খড়ম, হুঁকো, ফুলদানি, রান্নাঘরে ব্যবহৃত তৈজসপত্র, লণ্ঠনসহ অনেক কিছু।''
এরপর নানী বললেন, ''রবি ঠাকুর আজ নেই, কিন্তু তার পায়ের ধূলো ঠিকই রয়ে গেছে এই মাটিতে।'' বলেই তিনি কাচারী ঘরের মেঝে থেকে কিছু ধূলো আমার গায়ে-গালে-কপালে লেপন করে দিলেন আর বললেন, ''রবি ঠাকুরের মতন বড় মানুষ হইয়ো।''
কোনো ঈশ্বর আমাকে বর দেয়নি কোনো দিন, তবে আমার নানী আমাকে বর দিয়েছিলেন সেদিন। তাঁর হাতের ধুলো মাখা বর আমার প্রাণে প্রদীপ জ্বেলে ছিল।

এরপর ঠাকুরবাড়ির ধূলি গায়ে মেখে নানীর আঁচল ধরে হযরত শাহ মখদুম-এর মাজারের দিকে রওনা হলাম।

প্রথম প্রকাশ আমার ব্লগে http://blog.cartoonistarif.com/2016/07/54546.html

প্রকৃতি ভ্রমণে একদিন

তখন গ্রীষ্মকাল ছিল। আজ থেকে পাঁচ বছর আগে মধ্য-দক্ষিণ নরওয়ের পর্বত ঘেরা প্রকৃতি ভ্রমণে গিয়েছিলাম আমার এক বন্ধুর নিমন্ত্রনে। সেদিনের শেষ বিকেলে বারান্দায় দাঁড়িয়ে নিজেকে স্বর্গলোকে আবিষ্কার করেছিলাম এই দেখে যে, সেখানে সময় অসময়ে মেঘেরা আসে পর্বতকে আলিঙ্গন করতে। আমি মেঘের মাঝে হেটে ছিলাম পর্বতের গা বেয়ে। চারিদিকে ঝর্ণার কলকলে ধ্বনি, পাখিদের কিচিরমিচির আর ভূপৃষ্ঠের সবুজ লতা-গুল্মে পুষ্পরাজিরা মেতেছিলো আপন রূপ প্রদর্শনের প্রতিযোগিতায়। সে এক অপরূপ দৃশ্য।

নরওয়েজীয় বন্ধুর বাংলো থেকে গাড়ি চালিয়ে প্রায় এক ঘন্টার পথ পেরিয়ে আমরা গিয়েছিলাম মালভূমি পরিভ্রমনে। মালভূমির উপরেই রয়েছে এক পর্বতমালা। এই অঞ্চলটিকে ঘিরে একাধিক পৌরাণিক গল্পকাহিনী প্রচলিত আছে। এই স্থানকে নরওয়েজিয়ান ভাষা বলা হয় ''Jotunheimen'' বাংলায় ভাবার্থ দাঁড়ায় ''দৈত্যদের নিবাস''।

ভূপৃষ্ঠে ছোট বড় অসংখ্য পাথর, পানির কলকল ধ্বনি শুনতে পাচ্ছিলাম, পর্বতের গা বেয়ে ছোট বড় অসংখ্য পানির ধারাও চোখে পড়ছিলো। কোথাও পানি জমে ছোট্ট ডোবা বা পুকুরের মত সৃষ্টি হয়েছে আর সেই পানিকে কেন্দ্র করে একধরণের পাখির আনাগোনা চোখে পড়ার মত।
প্রায় জনমানব শূন্য অঞ্চল, আমার খুব ইচ্ছে হয়েছিল পর্বতারোহন করতে। তাই হাটতে হাটতে পর্বত বেয়ে উঠেছিলাম ভূপৃষ্ঠ থেকে আনুমানিক ১৩০০ মিটার উপরে। যতই উপরের দিকে উঠছিলাম তাপমাত্রা ততই গরম অনুভূত হচ্ছিলো, আমি প্রচন্ড ঘামছিলাম। উঠতে উঠতে আমি একটা পর্বতের চূড়ায় উঠেছিলাম। পর্বতের চূড়ায় গরম তাপমাত্রা মধ্যে তুষারের অস্তিত্ব আবিষ্কার করলাম। পর্বতের গা বেয়ে ঠান্ডা জমাট বাঁধা তুষার।

প্রথম প্রকাশ আমার ব্লগে
http://blog.cartoonistarif.com/2016/07/75675.html

উত্তরের আলো

২০১৫ সালের নভেম্বর মাসের শেষের দিকে উত্তর নরওয়েতে গিয়েছিলাম একটি সংস্থার আমন্ত্রণে।
তখন প্রচন্ড ঠান্ডা, মাইনাস ৩০ ডিগ্রির মতো ঠান্ডা। সংস্থার আমন্ত্রণে রাশিয়ান এক কমিক আর্টিস্টও এসেছিলেন। সারা বিকেল তিনি এবং আমি প্রচন্ড ঠান্ডা আর তুষারের মাঝে ঘুরে বেড়ালাম, এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে। 
রাতের খাওয়ার পর সংস্থার একজন জানালেন যে আজ আকাশে উত্তরের আলো দেখা যাচ্ছে, দেখতে চাইলে বাইরে আসতে পারেন। উত্তরে এলাম আর উত্তরের আলো দেখবো না তাই কি কখনো হয়? আমি আর রাশিয়ান যুবতী রাত দশটার দিকে বের হলাম উত্তরের আলো দেখবো বলে। প্রচন্ড ঠান্ডা আর বরফ জমে রাস্তা পিচ্ছিল হয়েছিল আমরা সাবধানে হাটতে হাটতে সাগর তীরে গিয়ে আকাশের দিকে তীর্থের কাকের মতো তাকিয়ে রইলাম আধা ঘন্টার মতো, ঠান্ডায় আমরা যেন জমে যাচ্ছিলাম এমন অবস্থা প্রায়। এরপর হঠাৎ আকাশে দেখা মেললো উত্তরের আলো। প্রায় দশ মিনিট পর সবুজ রঙের আলোর আভা আঁধারে মিলিয়ে গেলো আর আমরা হোটেলে ফিরে এলাম।

আরিফুর রহমান,
নরওয়ে

ছবি: আলেজান্দ্রো গঞ্জালেজ

পুঁথি পরিসংখ্যান